পাইলট হয়ে উড়ে বেড়ানোর স্বপ্ন দেখতেন শহীদ সিয়াম

মা ছেলেকে ডাক্তার বানানোর স্বপ্ন দেখলেও ছেলে স্বপ্ন দেখত পাইলট হয়ে অ্যাডভেঞ্চারের, বিশ্ব ঘুরে দেখার। কিন্তু ফ্যাসিবাদী হাসিনার খুনি বাহিনীর প্রাণঘাতী গুলিতে শহীদ হয়ে অকালে ওপারে পাড়ি জমিয়েছেন সেই স্বপ্নবাজ তরুণ আলিফ আহমেদ সিয়াম।

ঢাকার সাভারের ডেইরি ফার্ম হাই স্কুলের দশম শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন আলিফ আহমেদ সিয়াম (১৫)। তুখোড় মেধাবী ও সাহসী সিয়াম নিয়মিত বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মিছিল-মিটিংয়ে অংশ নিতেন, সক্রিয় ভূমিকা রাখতেন।

জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার গণ-আন্দোলনের চূড়ান্ত দিন ৫ই আগস্ট বেলা সাড়ে ১১টায় বাসা থেকে বের হয়ে ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচিতে অংশ নেন সিয়াম। এ সময় সাভার থানার বাসস্ট্যান্ড ফুটওভার ব্রিজের নিচে আনুমানিক দুপুর ২:৩০টার দিকে মাথায় গুলিবিদ্ধ হন তিনি। গুলিটি মাথার নিচে দুই ভ্রুর মাঝখান দিয়ে ঢুকে পিছন দিয়ে বের হয়ে যায়।

এরপর দুপুর ৩:৩০টার দিকে খবর পেয়ে মা তানিয়া আক্তার সিয়ামকে সাভারের এনাম মেডিকেলে ভর্তি করান। কিন্তু বাঁচানো যায়নি তাকে।আইসিইউতে লাইফ সাপোর্টে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৭ই আগস্ট সন্ধ্যা ৬টায় শাহাদাত বরণ করেন সিয়াম।

ইসলাম নগর বাজার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ ও জাহাঙ্গীরনগর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে জানাজা শেষে, শহীদ সিয়ামের লাশ ৮ আগস্ট ভোর ৫টায় বাগেরহাটের বাঁশবাড়ীয়া গ্রামে পৌঁছে এবং পারিবারিক কবস্থানে দাফন করা হয়।

পেশায় শিক্ষক শহীদ আলিফ আহমেদ সিয়ামের মা তানিয়া আক্তার। তিনি ছেলেকে ডাক্তার বানানোর ইচ্ছা পোষণ করতেন। তবে আলিফ তার মাকে বলতেন, তিনি পাইলট হবেন, বিশ্ব ঘুরে দেখবেন এবং পরিবারের সবাইকে নিয়ে পবিত্র হজব্রত পালন করবেন।

মা তানিয়া সিয়ামকে আন্দোলনে না যেতে অনুরোধ করেন। কিন্তু এতে দমে না গিয়ে সিয়াম তার মাকে বলেছিলেন, ‘হয় বীরের মতো বাঁচব, নইলে বীরের মতো মরব।’

তানিয়া আক্তার বলেন, ‘আমি স্বামীর বদলে আমার ছেলের নামে পরিচিত হতে চেয়েছিলাম। এখন সবাই আমাকে শহীদ আলিফের মা হিসেবেই চেনে।’

১৭ জুলাই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে মিছিলে রাবার বুলেট ও টিয়ার সেলে আক্রান্ত হন আলিফ। কিন্তু আন্দোলন থেকে পিছ পা হননি। সিয়াম ক্লাস ওয়ানে ও ক্লাস সিক্সে জাহাঙ্গীর নগর স্কুল কলেজ এন্ড ইউনিভার্সিটিতে পরীক্ষা দিয়ে কোটার কারণে ভর্তি হতে পারেননি। তাই কোটা সংস্কার আন্দোলনে সক্রিয় ভুমিকা পালন করেন। ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনে শেষ দিন পর্যন্ত রাজপথে ছিলেন তিনি।

আলিফ আহমেদ সিয়াম বাগেরহাট সদর উপজেলার ডেমা ইউনিয়নের বাঁশবাড়ীয়া কাশিমপুর এলাকার ব্যবসায়ী মো. বুলবুল কবীর ও শিক্ষিকা তানিয়া আক্তারের একমাত্র ছেলে। সিয়ামের একটাই বোন, ইসরাত জাহান লামহা (১২), বর্তমানে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় স্কুল ও কলেজে ৭ম শ্রেণির শিক্ষার্থী।

ছেলে হারানো মাকে জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশন ৫ লাখ, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ২ লাখ এবং ঢাকার স্থানীয় বিএনপি ১ লাখ টাকা অনুদান দিয়েছে।

শহীদ সিয়ামের বাবা ব্যবসায়ী বুলবুল কবীর বলেন, ‘আমার সন্তান দেশের স্বৈরাচারী শাসনের পতন তরান্বিত করতে নিজের জীবন বিসর্জন দিয়েছে।’ তিনি শহীদ আলিফের নামে বাগেরহাটের কোনো স্কুল, কলেজ অথবা হাসপাতালের নামকরণের দাবি জানান।

বুলবুল কবীর আরও বলেন, ‘ফ্যাসিবাদী খুনি হাসিনার নির্দেশে বিডিআর হত্যা, হেফাজতে ইসলাম হত্যা, এবং ২ হাজারের বেশি ছাত্র-জনতাসহ অসংখ্য মানুষকে হত্যা করেছে। তার বিচার ও সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করছি।’

4 thoughts on “পাইলট হয়ে উড়ে বেড়ানোর স্বপ্ন দেখতেন শহীদ সিয়াম

  1. আলিফ আহমেদ সিয়াম বাগেরহাট সদর উপজেলার ডেমা ইউনিয়নের বাঁশবাড়ীয়া কাশিমপুর এলাকার ব্যবসায়ী মো. বুলবুল কবীর ও শিক্ষিকা তানিয়া আক্তারের একমাত্র ছেলে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *