ওমর ফারুক
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের মানুষ এক নতুন প্রত্যাশায় বুক বেঁধেছিল। অনেকেই বিশ্বাস করেছিলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের হাতে দেশ পাবে এক স্বচ্ছ, নীতিনিষ্ঠ, দলনিরপেক্ষ প্রশাসনিক সংস্কৃতি, বিশেষ করে গণমাধ্যমের ক্ষেত্রে, যেখানে আগের সরকারগুলো স্বজনপ্রীতি ও রাজনৈতিক বিবেচনায় লাইসেন্স বিতরণের অভিযোগে ঘেরা ছিল।
কিন্তু সাম্প্রতিক একটি সিদ্ধান্ত আবারও সেই আস্থায় প্রশ্ন তোলে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ‘নেক্সট টিভি’ ও ‘লাইভ টিভি’ নামে দুটি নতুন বেসরকারি টেলিভিশনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। আর এখান থেকেই শুরু হয়েছে বিতর্ক।
কারা পেলেন এই লাইসেন্স?
সরকারি রেকর্ড অনুযায়ী, ‘নেক্সট টিভি’র লাইসেন্স পেয়েছেন মো. আরিফুর রহমান তুহিন,
যিনি জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক। এর আগে তিনি একটি ইংরেজি দৈনিকের স্টাফ রিপোর্টার ছিলেন। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে তিনি জাতীয় নাগরিক কমিটিতে যোগ দেন এবং পরে এনসিপির নেতৃত্বে আসেন।
অন্যদিকে, ‘লাইভ টিভি’র অনুমোদন পেয়েছেন আরিফুর রহমান, যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে পড়াশোনা শেষ করেছেন ছয় বছর আগে। ছাত্রজীবনে তিনি একটি ইংরেজি দৈনিকের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক ছিলেন এবং নাগরিক কমিটির সদস্য ছিলেন, যদিও এনসিপিতে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেননি।
প্রশ্ন উঠেছে- এই দুই ব্যক্তি কি টেলিভিশন চ্যানেল পরিচালনার মতো আর্থিক সক্ষমতা, অভিজ্ঞতা ও প্রতিষ্ঠানিক কাঠামো রাখেন? তাদের পেছনে কারা বিনিয়োগ করছেন? আর কোন বিবেচনায় অন্তর্বর্তী সরকার তাদের হাতে এই লাইসেন্স তুলে দিল?
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, “আগের প্রথা অনুযায়ী নতুন টিভির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। সুনির্দিষ্ট নীতিমালা এখনো প্রক্রিয়াধীন।” অর্থাৎ, নীতিমালা ছাড়া অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। যা স্বয়ং সরকারের ঘোষিত গণমাধ্যম সংস্কারের প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
সরকারের তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলম অবশ্য রাজনৈতিক বিবেচনায় লাইসেন্স দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, “ফ্যাসিবাদবিরোধীদের হাতে নতুন মিডিয়া এনে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি করাই সরকারের উদ্দেশ্য।”
কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়, “প্রতিযোগিতা” যদি আবারও দলীয় ঘনিষ্ঠদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে,
তবে তা কি সত্যিকারের প্রতিযোগিতা, নাকি পুরনো স্বজনপ্রীতির নতুন রূপ?
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ১৫ বছরে ২৮টি নতুন টিভি চ্যানেল অনুমোদন পায়।
তাদের মালিকানার বড় অংশ ছিল সরকার-ঘনিষ্ঠ রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী বা সাংবাদিকদের হাতে।
এখন অন্তর্বর্তী সরকারের হাতেও যেন সেই প্রক্রিয়ার পুনরাবৃত্তি দেখা যাচ্ছে।
গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে স্পষ্ট বলা হয়েছিল, “বেসরকারি টেলিভিশন খাতে দলীয় আনুগত্য, স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। এর ফলে বাজারে সক্ষমতার চেয়ে বেশি সংখ্যক লাইসেন্স দিয়ে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।”
এই মন্তব্য শুধু অতীতের জন্য নয়; বর্তমান বাস্তবতাতেও যেন অদ্ভুতভাবে প্রযোজ্য।
বাংলাদেশে টেলিভিশন লাইসেন্স এখন শুধু গণমাধ্যমের অনুমোদন নয়, এটি এক ধরনের বাণিজ্যিক সম্পদ হয়ে উঠেছে। অতীতে দেখা গেছে, বহু লাইসেন্সধারী ব্যক্তি অর্থনৈতিক সক্ষমতা না থাকা সত্ত্বেও লাইসেন্স পেয়ে পরে তা উচ্চমূল্যে বিক্রি করেছেন। কখনো সরকারের অনুমতি ছাড়াই।
একটি লাইসেন্স মানেই একটি সম্ভাব্য কোটি টাকার বাজার। যেখানে ‘মিডিয়া’ নয়, ‘মিডিয়া-বাণিজ্য’ চলে।
গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন সুপারিশ করেছিল, একটি “সম্প্রচার কমিশন” গঠন করে নতুন লাইসেন্স প্রদানের সব সিদ্ধান্ত সেই কমিশনের হাতে দেওয়া হোক। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার সেই সুপারিশ বাস্তবায়ন না করেই নতুন লাইসেন্স দিয়েছে। এটি কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, বরং পরিবর্তনের সুযোগ হারানো।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান যথার্থই বলেছেন, “এই সরকার গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে সম্মান জানাতে পারত, গণমাধ্যমে একটি নীতিনিষ্ঠ সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে পারত। কিন্তু এই সিদ্ধান্তে মনে হচ্ছে আমরা কর্তৃত্ববাদের পতন চাই, কিন্তু কর্তৃত্ববাদী সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখতে চাই।”
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা গড়ে উঠেছিল মূলত নৈতিকতার ভিত্তিতে। কিন্তু টেলিভিশন লাইসেন্স বিতরণের এই ঘটনাটি সেই আস্থায় ফাটল ধরিয়েছে। যদি গণমাধ্যমও আবার দলীয় প্রভাব, অনুগ্রহ বা গোপন সমঝোতার অংশ হয়ে যায়, তাহলে গণতন্ত্রের নবজাগরণের স্বপ্নও পুরনো ধোঁয়ায় ঢেকে যাবে।
বাংলাদেশে গণমাধ্যম কেবল ব্যবসা নয়, এটি রাষ্ট্র ও জনগণের বিবেকের আয়না। এই আয়নায় যদি আবার দলের মুখই দেখা যায়, তবে পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি কেবল শব্দে সীমাবদ্ধ থাকবে,
বাস্তবে নয়।
ওমর ফারুক
গণমাধ্যম কর্মী
