শাপলা প্রতীকের লড়াই: নিবন্ধনের দোরগোড়ায় এনসিপি, দ্বিধায় নির্বাচন কমিশন

ওমর ফারুক

বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আবারও উত্তাপ ছড়াচ্ছে প্রতীক ইস্যু। রাজনৈতিক দল হিসেবে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) নিবন্ধন পেতে যাচ্ছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলটির নিবন্ধন প্রক্রিয়া প্রায় শেষ পর্যায়ে, শুধু প্রতীক নির্ধারণই এখন মূল বাধা। তবে প্রতীক নিয়ে এনসিপি ও নির্বাচন কমিশনের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে এক ধরনের ‘ঠান্ডা যুদ্ধ’।

দলটির শুরু থেকেই দাবি তাদের প্রতীক হবে ‘শাপলা’। এনসিপির ভাষ্য, এই প্রতীকই তাদের আন্দোলন, কর্মসূচি এবং রাজনৈতিক দর্শনের সঙ্গে একীভূত হয়ে গেছে। কিন্তু সমস্যাটা হচ্ছে, ইসির গেজেটে প্রকাশিত ৫০টি অনুমোদিত প্রতীকের তালিকায় ‘শাপলা’ নেই। ফলে ইসি দলটিকে বলেছে, তালিকার মধ্য থেকে একটি বেছে নিতে। কিন্তু এনসিপি তাতে রাজি নয়; তারা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে “শাপলার বিকল্প নেই”।

দলের যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, “তারা (ইসি) কিন্তু আমাদের আগেই বলেছিল, যে ১৫০টি মার্কা অন্তর্ভুক্ত হবে, তার মধ্যে শাপলা থাকবে। সেই তথ্য জেনেই আমরা বলেছিলাম, আমাদের জন্য শাপলা সংরক্ষণ করা হোক। এরপরেই জুলাই পদযাত্রা সারাদেশের মানুষ খাল-বিল থেকে শাপলা তুলে আমাদের সমাবেশে এনেছিল। শাপলা এখন আমাদের দলের আত্মার সঙ্গে মিশে গেছে।”

ইসির কাছে পাঠানো চিঠির সঙ্গে দলটি এমনকি শাপলার ৭টি নমুনা প্রতীক জমা দিয়েছে, যাতে কমিশন বুঝতে পারে, তাদের দাবি কেবল প্রতীক নয়, এটি একটি প্রতীকী পরিচয়ের অংশ।

এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন বিষয়টিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেছেন। তিনি বলেন, “জাতীয় প্রতীকে যেমন শাপলা আছে, তেমনি ধানের শীষ, তারকা, পাটপাতাও আছে। ধানের শীষ আর তারকা তো অন্য দলকে দেয়া হয়েছে। তাহলে শাপলা কেন নয়? যেহেতু এটি জাতীয় প্রতীকের অংশ, তাই ইসির এতে বাধা দেয়ার কোনো যুক্তি নেই।”

এ বক্তব্যের মধ্য দিয়ে দলটি আসলে এক ধরনের সাংবিধানিক নৈতিক দাবি তুলে ধরেছে, জাতীয় প্রতীকের কোনো অংশ যদি অন্য দল ব্যবহার করতে পারে, তবে শাপলাও হতে পারে একটি রাজনৈতিক প্রতীক।

তবে নির্বাচন কমিশন এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করতে রাজি নয়। কমিশনের অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো বলছে, তালিকার বাইরে প্রতীক দিতে গেলে কিছু বিধিগত জটিলতা রয়েছে।

তবে নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ও নির্বাচন কমিশন সংস্কার কমিশনের সদস্য ড. জেসমিন টুলি ভিন্নমত পোষণ করেন। তাঁর মতে, “তালিকার বাইরে নতুন প্রতীক বরাদ্দে ইসির কোনো আইনি বাধা নেই। শুধু বিধিমালায় ছোট একটা সংশোধনী আনলেই শাপলা প্রতীক দেয়া সম্ভব। এটা কমিশনের ইচ্ছা বা সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করছে।”

অর্থাৎ আইন নয়, বরং প্রশাসনিক ইচ্ছার প্রশ্নেই আটকে আছে এনসিপির শাপলা প্রতীক।

এনসিপির নেতারা মনে করেন, প্রতীক না দেয়ার পেছনে হয়তো রাজনৈতিক প্রভাব কাজ করছে।

আখতার হোসেন বলেন, “আমাদের মনে হচ্ছে শাপলা প্রতীক না দেয়ার পেছনে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব আছে। হয়তো কোনো গোপন চাপ বা ষড়যন্ত্র কাজ করছে। যদি প্রতীক না দেয়ার কারণে নির্বাচনকেন্দ্রিক অচলাবস্থা তৈরি হয়, তার দায় নিতে হবে কমিশনকেই।”

দলের আরেক শীর্ষ নেতা সারোয়ার তুষার বলেন, “প্রতিটি ইস্যুতেই আমাদেরকে হয়রানির মধ্যে রাখা হচ্ছে। মনে হচ্ছে ইসি চায় না আমরা নির্বাচনে অংশ নিই। তবে আমরা ফাইট দিবো। শাপলা না দিলে নির্বাচনে যাওয়ার বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করবো। এই প্রতীক ছাড়া নির্বাচনে যাবো না।”

প্রতীক ইস্যুর এই টানাপোড়েনে অনেক বিশ্লেষকই প্রশ্ন তুলছেন। যদি নতুন একটি দলের প্রতীক নিয়ে এমন জটিলতা তৈরি হয়, তাহলে আসন্ন নির্বাচন কতটা নিরপেক্ষ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে? ইসি যদি সত্যিই রাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে থেকে কাজ করতে চায়, তাহলে কেন একটি দলকে প্রতীকের কারণে নির্বাচন থেকে দূরে ঠেলে দেয়ার ঝুঁকি নিচ্ছে?

শাপলা একটি সাধারণ ফুল, কিন্তু এখন তা হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক প্রতীক, প্রতিরোধের চিহ্ন এবং ন্যায্যতার প্রশ্নের প্রতীক।

এনসিপি ও ইসির এই দ্বন্দ্ব কেবল একটি প্রতীক বাছাইয়ের ইস্যু নয়, এটি আসলে বাংলাদেশের নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় বিশ্বাস ও আস্থার সংকটের প্রতিফলন। শাপলা প্রতীক দেয়া বা না দেয়ার সিদ্ধান্ত কেবল একটি দলের ভাগ্য নির্ধারণ করবে না, এটি হয়তো প্রকাশ করবে, আমাদের নির্বাচন কমিশন সত্যিই স্বাধীন কি না।

ওমর ফারুক
গণমাধ্যম কর্মী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *