ওমর ফারুক
ঢাকার আকাশে আজও ভেসে বেড়াচ্ছে মাইকে উচ্চারিত এক স্লোগান, “আমরা শিক্ষক, ভিক্ষুক নই!”
কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের প্রাঙ্গণে কয়েক শ’ শিক্ষক–কর্মচারীর ভিড়। কারও হাতে প্ল্যাকার্ড, কারও কণ্ঠে ক্ষোভ, কারও চোখে হতাশা। তাঁরা দেশের প্রজন্ম গড়েন, অথচ নিজেদের ন্যায্য প্রাপ্যের দাবিতে আজ মঙ্গলবার টানা তৃতীয় দিনের মতো অবস্থান করছেন রাজধানীর হৃদয়ে। সূর্যের তাপে, রাতের শিশিরে, পুলিশের লাঠির আঘাতে সবকিছুর মধ্যেও তাঁরা অনড়।
তাদের দাবি একটাই, মূল বেতনের ২০ শতাংশ হারে বাড়িভাড়া ভাতা, ১ হাজার ৫০০ টাকার চিকিৎসা ভাতা, এবং কর্মচারীদের ৭৫ শতাংশ উৎসব ভাতা।
দাবি যতই সরল, বাস্তবায়নের পথে ততই জটিলতা। সরকারের প্রস্তাব এসেছে, কিন্তু তা ‘অপর্যাপ্ত’ বলা যায়, শিক্ষকদের আত্মমর্যাদায় আঘাত হানার মতোই।
‘এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণ প্রত্যাশী জোট’-এর পতাকা নিয়ে যখন শিক্ষকরা শহীদ মিনারে অবস্থান শুরু করেন, তখনও অনেকে ভাবেন এ আন্দোলন হয়তো ক্ষণস্থায়ী হবে। কিন্তু তৃতীয় দিনে এসে তা রূপ নিয়েছে এক লং মার্চে, এক ন্যায্যতার মিছিলে, যা দুপুরে সচিবালয়ের পথে রওনা দিয়েছে।
এই ‘মার্চ টু সচিবালয়’ শুধু একটা দাবি আদায়ের পদযাত্রা নয়, বরং এটি রাষ্ট্রের প্রতি এক নিঃশব্দ প্রশ্ন, যে শিক্ষক রাষ্ট্রকে মানুষ গড়ার কারখানা দেয়, সেই শিক্ষকের নিজের ঘরভাড়া কি সে বহন করতে পারবে না?
রোববার রাতে শহীদ মিনারের পলিথিনে মাথা রেখে ঘুমিয়েছেন শত শত শিক্ষক। কেউ জাতীয় পতাকা মুড়ে মাথার নিচে রেখেছেন, কেউ ছাত্রদের বানানো ব্যানার বিছিয়ে ঘুমিয়েছেন। তাঁদের মুখে কেবল একটি বাক্য- “আমরা ক্লাসরুমে ফিরব, যখন সম্মান ফিরে পাব।”
এ দৃশ্য আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় ৯০-এর দশকের ছাত্র আন্দোলন, অথবা ২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের তরুণ মুখগুলোকে। পার্থক্য শুধু একটাই এবার আন্দোলনের নেতৃত্বে আছেন সেই মানুষগুলো, যাঁদের হাতে কলম আর খাতা; যাঁরা আগামী প্রজন্মকে শেখান ন্যায়ের পাঠ।
সরকার ইতিমধ্যে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের জন্য কিছু প্রণোদনা ঘোষণা করেছে, বাড়িভাড়া ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা, উৎসব ভাতা ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি। কিন্তু এই সামান্য বৃদ্ধি বর্তমান জীবিকা ব্যয়ের সঙ্গে একেবারেই বেমানান। রাজধানী কিংবা বিভাগীয় শহরে যেখানে গড় বাড়িভাড়া ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা, সেখানে ১ হাজার ৫০০ টাকা ভাতা একরকম রসিকতাই বলা চলে।
অন্যদিকে, শিক্ষকেরা বছরে ২৫ শতাংশ হারে দুটি উৎসব ভাতা পেলেও সরকারি কর্মচারীদের তুলনায় তা এখনো অর্ধেক। এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা জাতীয় বেতন স্কেল অনুযায়ী বেতন পেলেও তাদের মর্যাদা ও সুরক্ষা এখনো ‘অর্ধেক রাষ্ট্রীয় নাগরিক’-এর মতো।
এ যেন এক অদ্ভুত বৈপরীত্য যে শিক্ষক প্রজন্মকে আলোকিত করেন, তিনি নিজেই অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আলো চাচ্ছেন।
রোববার প্রেস ক্লাবের সামনে পুলিশি ‘বলপ্রয়োগ’ সাউন্ড গ্রেনেড, লাঠিচার্জ ও জলকামান এই আন্দোলনকে নতুন রূপ দিয়েছে। শিক্ষক সমাজ, যাদের আমরা সাধারণত দেখি শ্রেণিকক্ষে শান্ত স্বভাবে পাঠদান করতে, তাঁরাই আজ রাস্তায় রাগে গর্জে উঠেছেন।
তাদের কণ্ঠে প্রতিবাদের গান, হাতে লাঠির দাগ। এ যেন বাংলাদেশের ইতিহাসে আরেক অধ্যায়, যেখানে শিক্ষক তার ন্যায্য প্রাপ্যের জন্য পথে নেমেছেন আর সেই পথরোধ করেছে রাষ্ট্রেরই নিরাপত্তা বাহিনী।
শিক্ষকদের আন্দোলন শুধু ভাতা বৃদ্ধির নয়, এটি সম্মানের লড়াই। একজন শিক্ষক মাস শেষে যে সামান্য বেতন পান, তা দিয়ে সংসার চালানোই কষ্টসাধ্য। ভাড়া, বাজার, চিকিৎসা, সন্তানের শিক্ষা সব মিলে অনেকেই ঋণের বোঝায় জর্জরিত। অথচ একই রাষ্ট্রে অনেক অদক্ষ কর্মকর্তা বা রাজনৈতিক নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তি পান দ্বিগুণ, কখনো তিনগুণ সুযোগ-সুবিধা।
এই বৈষম্যই আজ শিক্ষকদের রাস্তায় নামিয়েছে। তাঁরা শুধু বেতন নয়, সম্মানের প্রতিদান চাইছেন।
সরকারের সামনে এখন দুটি পথ: দ্রুত প্রজ্ঞাপন জারি করে শিক্ষকদের ন্যায্য দাবিগুলো পূরণ করা, অথবা শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও স্থবিরতার দিকে ঠেলে দেওয়া।
কারণ এখন সারাদেশে হাজার হাজার স্কুল–কলেজে পাঠদান বন্ধ। ক্লাসরুম খালি, ছাত্ররা বিভ্রান্ত, অভিভাবকেরা উৎকণ্ঠিত। এই অবস্থা যত দীর্ঘ হবে, ততই ক্ষতিগ্রস্ত হবে শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে শিক্ষকরা ছিলেন আন্দোলনের পুরোভাগে ভাষা আন্দোলন, গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ, সবক্ষেত্রেই। আজ সেই শিক্ষকরা যদি রাজপথে দাঁড়ান, তা কেবল আর্থিক দাবির কারণে নয়; বরং রাষ্ট্রের কাছে সম্মানের হিসাব চাইতে।
সরকার যদি এখনো তাদের কণ্ঠ না শোনে, তবে তা শুধু শিক্ষকদের নয় এ জাতির আত্মমর্যাদার পরাজয় হবে। কারণ, যে রাষ্ট্র তার শিক্ষকদের সম্মান দিতে জানে না, সে রাষ্ট্র কখনোই টেকসই জ্ঞানের সমাজ গড়তে পারে না।
ওমর ফারুক
গণমাধ্যম কর্মী
