ওমর ফারুক
গাজা উপত্যকার ধ্বংসস্তূপে এখন ধীরে ধীরে ফিরে আসছে জীবনের চিহ্ন। মাসব্যাপী ভয়াবহ সংঘর্ষের পর অবশেষে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে। শুরু হয়েছে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার এবং বন্দি বিনিময়ের প্রক্রিয়া। কিন্তু যুদ্ধ থেমে গেলেও এখন যে প্রশ্নটি সবচেয়ে বেশি আলোচিত “যুদ্ধবিরতির পর কে চালাবে গাজা?”
এই প্রশ্নের জবাব এখনো অস্পষ্ট, বরং জটিল হয়ে উঠছে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণে। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি যে ২০ দফা শান্তি পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছেন, সেটিই এখন গাজার ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থার মূল আলোচ্য বিষয়।
ট্রাম্পের প্রস্তাব: ‘দ্বি-স্তরীয় শাসনব্যবস্থা’: ট্রাম্পের প্রস্তাব অনুযায়ী, যুদ্ধোত্তর গাজায় একটি দ্বি-স্তরভিত্তিক প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলা হবে।
নিচের স্তরে থাকবে একটি ফিলিস্তিনি প্রশাসনিক কমিটি, যারা গাজার দৈনন্দিন প্রশাসন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও পুনর্গঠনের কাজ পরিচালনা করবে।
উপরের স্তরে থাকবে একটি আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বোর্ড, যার নাম দেওয়া হয়েছে “বোর্ড অব পিস”।
এই বোর্ডের নেতৃত্বে থাকবেন ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজে এবং সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার। তাঁদের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারেন কিছু আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক কূটনীতিক। এ বোর্ডের কাজ হবে গাজার অর্থনীতি, প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং ফিলিস্তিনি কমিটিকে তদারকি করা।
মূলত, এটিই হবে গাজার অঘোষিত বা পরোক্ষ সরকার—যা স্থানীয় প্রশাসনের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখবে কিন্তু সরাসরি শাসন করবে না।
মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশ্লেষক ড. সানাম ওয়াকিল বলেন, “এটা কার্যত এমন একটি ব্যবস্থার ইঙ্গিত দেয়, যেখানে ফিলিস্তিনিরা প্রশাসনিকভাবে স্বাধীন থাকবে কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা আন্তর্জাতিক নেতৃত্বের হাতে থাকবে। এটি একধরনের ‘হাইব্রিড গভর্ন্যান্স মডেল’, যা গাজার মতো জটিল ভূরাজনৈতিক অঞ্চলে কার্যকর হবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, ট্রাম্প প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় “আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী” গঠনের কথাও বলা হয়েছে—যা হামাসের নিরস্ত্রীকরণ, ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার তদারকি, এবং একটি ফিলিস্তিনি নাগরিক পুলিশ বাহিনী গঠনের দায়িত্ব পাবে। কিন্তু এই বাহিনীর গঠন ও কাঠামো সম্পর্কে এখনো কোনো বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি।
অন্যদিকে, হামাস, ইসলামিক জিহাদ এবং পপুলার ফ্রন্ট ফর দ্য লিবারেশন অব প্যালেস্টাইন (PFLP) এক যৌথ বিবৃতিতে জানিয়েছে, “গাজার শাসনব্যবস্থা সম্পূর্ণরূপে ফিলিস্তিনিদের অভ্যন্তরীণ বিষয়। কোনো বিদেশি শক্তির প্রস্তাবিত শাসন বা তত্ত্বাবধান গৃহীত হবে না।”
তাদের দাবি, গাজার পুনর্গঠন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার দায়িত্ব নিতে হবে ফিলিস্তিনিদের মধ্যেই, আন্তর্জাতিক শক্তি নয়। এই অবস্থানের কারণে ট্রাম্পের প্রস্তাব কার্যকর করতে গেলে তীব্র রাজনৈতিক প্রতিরোধের মুখে পড়তে পারে বলে ধারণা বিশ্লেষকদের।
ইসরায়েলি সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ট্রাম্প প্রস্তাবে সমর্থন জানায়নি, তবে তারা “অংশগ্রহণমূলক আলোচনা” চালিয়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছে তেলআবিবের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
ইসরায়েলের প্রধান শর্ত হলো, হামাসকে সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ করতে হবে, এবং ভবিষ্যতে কোনো অবস্থাতেই তারা রাজনৈতিক ক্ষমতায় ফিরে আসতে পারবে না।
অন্যদিকে, মিশর, কাতার ও সৌদি আরবের মতো আঞ্চলিক শক্তিগুলো গাজার পুনর্গঠনে অর্থনৈতিক সহায়তা দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে, তবে তারা সরাসরি কোনো বিদেশি শাসন বা আন্তর্জাতিক বোর্ডের অধীন গাজা পরিচালনার পক্ষে নয়।
বর্তমান পরিস্থিতিতে গাজার ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে দ্বিতীয় দফা মিসর আলোচনার ওপর, যেখানে শুক্রবার ডোনাল্ড ট্রাম্প অংশ নেবেন বলে হোয়াইট হাউস নিশ্চিত করেছে।
তবে বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, যদি হামাস এবং অন্যান্য ফিলিস্তিনি সংগঠন পরিকল্পনাটি প্রত্যাখ্যান করে, আর ইসরায়েল ট্রাম্প প্রস্তাবের শর্ত মেনে না নেয়, তাহলে যুদ্ধবিরতির স্থায়িত্ব নিয়েও নতুন প্রশ্ন উঠবে।
ড. ওয়াকিলের মতে, “এই পরিকল্পনা একটি সুযোগ তৈরি করতে পারে, কিন্তু এটি স্থায়ী শান্তির নিশ্চয়তা নয়। এখানে আন্তর্জাতিক সমন্বয়, ফিলিস্তিনিদের আস্থা এবং আঞ্চলিক কূটনীতির ভারসাম্য প্রয়োজন। এর একটিও অনুপস্থিত হলে গাজা আবারও অস্থিরতার মুখে পড়বে।”
যুদ্ধবিরতির পর গাজা এখন যেন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে যুদ্ধবিধ্বস্ত মানুষের ফিরে আসা, অন্যদিকে ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থা নিয়ে আন্তর্জাতিক দরকষাকষি। ফিলিস্তিনিরা চায় নিজস্ব শাসন, আর পশ্চিমা নেতৃত্ব চাইছে আন্তর্জাতিক তদারকির আওতায় স্থিতিশীলতা।
এ দুই মেরুর টানাপোড়েনের মধ্যেই নির্ধারিত হবে, যুদ্ধবিরতির পর গাজা সত্যিই শান্তির পথে ফিরবে, নাকি নতুন এক অঘোষিত সংঘাতের দিকে এগোবে।
ওমর ফারুক
গণমাধ্যম কর্মী
