বাসডুবিতে গাফিলতির সংবাদ থামাতে সাংবাদিককে ‘টাকা দেয়ার চেষ্টা’

রাজবাড়ীর দৌলদিয়ার ফেরিঘাটে বাসসহ পন্টুন থেকে নদীতে পড়ে ২৬ জনের সলিল সমাধির ট্রমা কাটছে না। কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী সৌহার্দ্য পরিবহনের বাসটি পন্টুন থেকে পড়ে পদ্মা নদীতে ডুবে যায়।

বিআইডব্লিউটিসির অবহেলা?

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন সংস্থার (বিআইডব্লিউটিসি) টার্মিনাল সুপারিনটেনডেন্ট (টিএস) পদে কর্মরতদের কাজ কোন ফেরি কোন ঘাটে ভিড়বে এবং ফেরি থেকে গাড়ি আনলোড হওয়ার পর জিরো পয়েন্ট থেকে সিরিয়ালি গাড়িগুলো ফেরিতে ওঠানোর ব্যবস্থা করা। সহজ কথায় ফেরিতে গাড়ি ওঠা-নামা দেখভাল করা।

তাদের ডিউটি ফেরির পন্টুন থেকে সংযোগ সড়ক পর্যন্ত। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ফেরিঘাটের টিএসরা নিয়মমাফিক ডিউটি পালন করেন না। ডিউটির সময় তারা দোকান-অফিসে গিয়ে চা পান ও আড্ডা দেন। দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে পদ্মা নদীতে বাস পড়ে অন্তত ২৬ জনের মৃত্যুর ঘটনায় সামনে এসেছে বিআইডব্লিউটিসির দায়িত্বে অবহেলার বিষয়টি।

ঘটনার সময় কোথায় ছিলেন ‘টিএস’?

বাসডুবির ঘটনার দিন দায়িত্বে থাকার কথা ছিল টিএস মাসুদ জামানের। তবে তিনি ঘটনাস্থলে ছিলেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। তার পরিবর্তে আরেকজন দায়িত্ব পালন করছিলেন বলেও কেউ কেউ অভিযোগ করেন। তবে মাসুদ কিংবা অন্য যিনিই দায়িত্বে ছিলেন তিনি ফেরি আনলোড হওয়ার আগেই অপেক্ষায় থেকে গাড়িগুলো ফেরিতে ওঠার অনুমতি দেন। এ কারণে সৌহার্দ্য পরিবহনের বাসটি ব্রেক ফেইল করলেও ফেরি লোড থাকায় চালক বাধ্য হয়ে সোজা নদীতে নামিয়ে দেন। ফেরি আনলোড থাকলে হয়তো চালক ডানে ঘুরিয়ে সরাসরি ফেরিতে উঠতে পারতেন। ফেরিতে উঠলে সেদিন বাসটিতে থাকা যাত্রীরা হয়তো প্রাণে বেঁচে যেতেন।

খোঁজ মিললো টিএস মাসুদের

বাসডুবির দিন দৌলতদিয়া ৩ নম্বর ঘাটের দায়িত্ব ছিল বিআইডব্লিউটিসির টার্মিনাল সুপারিনটেনডেন্ট (টিএস) মাসুদ জামানের। মাসুদ এখন কোথায় আছেন জানতে দৌলতদিয়া বিআইডব্লিউটিসির একাধিক কর্মকর্তা ও কর্মচারীর শরণাপন্ন হয় জাগো নিউজের এক সাংবাদিক। এর মধ্যে মাসুদের কাছে খবর চলে যায় জাগো নিউজের সাংবাদিকরা তাকে খুঁজছেন। মাসুদের সাক্ষাৎ পেতে টিম জাগো নিউজ উপস্থিত দৌলতদিয়া বিআইডব্লিউটিসির কার্যালয়ে। সেখানে দেখা মেলে আরেক টিএস জাহাঙ্গীরের সঙ্গে। তিনি ঘাট সিন্ডিকেটের একজন হিসেবে পরিচিত। তিনি কিছুতেই চাইছিলেন না মাসুদ সামনে আসুক। সাংবাদিক পরিচয় পেয়েই জাহাঙ্গীর কিছু টাকা হাতে গুঁজে দেওয়ার চেষ্টা করেন।

আপনি টাকা দিচ্ছেন কেন প্রশ্ন করা হলে জাহাঙ্গীর বলেন, ‘ভাত খাওয়ার জন্য, আপনারা ভাত খাবেন।’

এক পর্যায়ে অনেকটা বাধ্য হয়ে জাগো নিউজের সাংবাদিককে বিআইডব্লিউটিসি কার্যালয়ে প্রবেশে অনুমতি দেন টিএস জাহাঙ্গীর। আর ফোনে টিএস মাসুদকে বিআইডব্লিউটিসির কার্যালয়ে ডাকা হয়। মিনিট পাঁচেক পর টিএস মাসুদ কার্যালয়ে আসেন। সাংবাদিক দেখে মাসুদের চেহারায় কিছুটা আতঙ্কের ছাপ ছিল।

মাসুদের সঙ্গে সাংবাদিকের কথোপকথন

মাসুদের কাছে প্রথমে জানতে চাওয়া হয় বাস নদীতে পড়ে যাওয়ার দিন ৩ নম্বর ফেরিঘাটে কয়টা থেকে ডিউটি ছিল। মাসুদ বলেন, দুপুর ২টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত।

সাংবাদিক: আপনার সঙ্গে আর কে কে ছিলেন ডিউটিতে?

মাসুদ: আমি একাই ছিলাম।
সাংবাদিক: আপনার ডিউটি কোন জায়গা থেকে কোন পর্যন্ত?
মাসুদ: ফেরির পন্টুন থেকে সংযোগ সড়ক পর্যন্ত।
সাংবাদিক: আমাদের কাছে প্রমাণ আছে আপনি ঘটনার সময় ফেরির পন্টুন কিংবা সংযোগ সড়কেও ছিলেন না, মূল সড়কে কোনো এক দোকানের সামনে আড্ডা দিচ্ছিলেন।
মাসুদ: না, আমি সংযোগ সড়কের দোকানের পাশে ছিলাম। অনেক সময় আমরা সাইডে থাকি। বাস যখন পড়ে যায় তখন আমার স্যারদের ফোন করে জানাই।
সাংবাদিক: বাস যখন পড়ে যায় তখন ৩ নম্বর ঘাটে ফেরি কয়টা ছিল?
মাসুদ: একটা শুধু ‘হাসনাহেনা’, তখন গাড়িগুলো ফেরি থেকে আনলোড হচ্ছিল।
সাংবাদিক: হাসনাহেনা ফেরির গাড়িগুলো আনলোড শেষ না হওয়ার আগে কেন ফেরি পারাপারের জন্য গাড়ি পন্টুনে এলো?
মাসুদ: ৭ নম্বর ঘাটে ফেরি মিস করে সৌহার্দ্য। এরপর গাড়িটি তিন নম্বর ঘাটে চলে আসে।
সাংবাদিক: আপনাদের কথা না মানলে পুলিশের সহযোগিতা কেন নেননি?
মাসুদ: অনেক সময় পুলিশকেও মানতে চান না চালকরা।
সাংবাদিক: এ পর্যন্ত কোনো চালকের বিরুদ্ধে আপনারা ব্যবস্থা নিয়েছেন?
মাসুদ: না, নেইনি।

মাসুদের সঙ্গে পুরো কথোপকথনে অস্বস্তিবোধ করছিলেন। বারবার চেয়ার থেকে উঠে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন তিনি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিআইডব্লিউটিসির দৌলতদিয়া ঘাটের সহ-মহাব্যবস্থাপক (বাণিজ্য) মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিন বলেন, ‘মাসুদ তিন নম্বর ঘাটে ছিলেন। মাসুদের জবানবন্দি নিয়েছে তদন্ত কমিটি। সেদিন কে ছিলেন আর কে ছিলেন না পয়েন্ট টু পয়েন্ট ধরে তদন্ত হচ্ছে।’

ঘাট পরিচালনায় অব্যবস্থাপনার ছাপ

সৌহার্দ্য পরিবহনের বাসটি নদীতে পড়ে যাওয়ার পেছনে ঘাট কর্তৃপক্ষের অব্যবস্থাপনা রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। নিয়ম অনুযায়ী, ঘাট পার হতে আসা যানবাহন পন্টুনে ওঠার আগে সড়কে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়াবে। এরপর ঘাটে আসা ফেরি থেকে সব যানবাহন নেমে যাওয়ার পর অপেক্ষায় থাকা যানবাহনগুলো ফেরিতে উঠবে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, বুধবার বিকেলে হাসনাহেনা নামের ফেরিটি ঘাটে এসে পৌঁছাতেই সংযোগ সড়ক থেকে চলতে শুরু করে সৌহার্দ্যসহ অন্য গাড়ি।

সৌহার্দ্য পরিবহনের দৌলতদিয়া ঘাট তত্ত্বাবধায়ক মনির হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ‘দৌলতদিয়া ফেরিঘাটের জিরো পয়েন্টে অনেক সময় বিআইডব্লিউটিসির তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীরা দায়িত্বে থাকেন। ঘাটের পরিস্থিতি না বুঝেই অনেক সময় নদী পাড়ি দিতে আসা ঢাকামুখী গাড়িগুলোকে ফেরিঘাটে পাঠিয়ে দেন।’

সেই পন্টুন ওঠার সড়ক

কুমারখালী থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী জামান পরিবহনের সুপারভাইজার ইমরান হোসেন বলেন, ‘একটি বাস পার হতে যে পরিমাণ টাকা দিতে হয় সেই পরিমাণ সেবা আমরা পাই না। ফেরিঘাটে কোনো নিরাপত্তা নেই। ফেরির জন্য অপেক্ষা করতে হলে যাত্রীরা নেমে ওয়াশরুমে যেতে চান কিন্তু সরকারি কোনো ওয়াশরুম নেই। বিআইডব্লিউটিসির লোকজন আমাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেন।’
সংযোগ সড়ক ঢালু ও খানাখন্দে ভরা

দৌলতদিয়া ও পাটুরিয়া ফেরিঘাটে মূল সড়ক থেকে পন্টুন পর্যন্ত সংযোগ সড়কগুলো বেশ ঢালু। সরেজমিনে দেখা যায়, দুই ঘাটেই সড়কগুলো খানাখন্দে ভরা। এতে যাত্রী ও মালামাল নিয়ে যানবাহনগুলোতে ফেরিতে ওঠানামা করতে প্রচণ্ড বেগ পেতে হয়। মাঝেমধ্যে এই সংযোগ সড়কে যানবাহন আটকে যাচ্ছে, কখনো দুর্ঘটনাও ঘটছে।

গত ১১ মার্চ রাতে পাটুরিয়ার ৫ নম্বর ফেরিঘাটে পন্টুন থেকে নেমে উঁচু সংযোগ সড়ক দিয়ে মূল সড়কে ওঠার সময় সয়াবিন তেলবাহী একটি লরি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পেছনের দিকে গিয়ে নদীতে ডুবে যায়। এতে অল্পের জন্য গাড়িচালক ও সহকারী প্রাণে বেঁচে যান।

ফেরিঘাটে সংযোগ সড়কের প্রান্তে নদীতীরে পন্টুন বাঁধা থাকে। এই পন্টুনের ওপর দিয়েই ফেরিতে যানবাহন ওঠানামা করে। দৌলতদিয়ার ৩ নম্বর ঘাটের পন্টুনটিতে তিনটি পকেট দিয়ে ফেরিতে যানবাহন ওঠানামা করে।

দুর্ঘটনার পরদিন সরেজমিনে দেখা যায়, অত্যন্ত পুরোনো ও আকারে ছোট পন্টুনটি অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। লোহার রেলিং বা নিরাপত্তাবেষ্টনী নেই। এতে যাত্রী ও যানবাহনকে ফেরিতে ঝুঁকি নিয়ে ওঠানামা করতে হয়। অন্য দুটি ৪ ও ৭ নম্বর ঘাটেরও একই চিত্র।

এ ঘটনায় বুধবার মধ্যরাতেই রাজবাড়ী জেলা প্রশাসন থেকে পাঁচ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট উছেন মে কমিটির আহ্বায়ক। তদন্ত কমিটিকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে জেলা প্রশাসকের কাছে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য বলা হয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক সুলতানা আক্তার।

এছাড়া নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় থেকেও ছয় সদস্যের তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। এই তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. মুহিদুল ইসলাম। কমিটিকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে।

দুর্ঘটনার পরদিন ৩ নম্বর ফেরিঘাটের পন্টুনে বাসডুবির ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন সংস্থার (বিআইডব্লিউটিসি) চেয়ারম্যান মো. সলিম উল্লাহ বলেন, ‘ফেরিতে ওঠার আগে বাস থেকে যাত্রীদের নামাতে হবে। এরপর শুধু চালক গাড়ি নিয়ে ফেরিতে উঠবে। এছাড়া পন্টুনগুলোতে রেলিংয়ের ব্যবস্থা এবং ফেরি ও ঘাট ব্যবস্থাপনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের আধুনিক মানের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হবে।’

তিনি বলেন, যা শুনেছি, গাড়িটি (বাস) ব্রেক ফেল করেছে। সাধারণত গাড়িগুলো পন্টুনে আসার আগে থামে। এরপর সুবিধামতো ফেরিতে ওঠে। কিন্তু এ ঘটনার ক্ষেত্রে হয়েছে যে হাসনাহেনা ফেরিটি প্রস্তুত ছিল না, কিন্তু তার আগেই গাড়িটির চালকের ভুলে (পন্টুনে) এসেছে। কারণ, ফেরিতে থাকা গাড়িগুলো আগে আনলোড হবে, এরপর নতুন করে (ফেরিতে) লোড হবে।’

দুর্ঘটনায় কারও গাফিলতি (দায়িত্ব অবহেলা) রয়েছে কি না প্রশ্নের জবাবে বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যান বলেন, দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তিন দিনের মধ্যে এই তদন্তের রিপোর্ট দেবে। তদন্ত প্রতিবেদনে কারও গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া গেলে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

রবিবার (২৯ মার্চ) সচিবালয়ে সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহন বিষয়ক মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম সাংবাদিকদের বলেন, বাস থেকে শতভাগ যাত্রী নামিয়ে সেই গাড়ি ফেরিতে তুলতে হবে। পাশাপাশি ফেরিতে ব্যারিয়ার লাগানো হবে।

মন্ত্রী বলেন, ফেরিতে গাড়ি ওঠার সময় অবশ্যই শতভাগ যাত্রী নামিয়ে নিশ্চিত করে ফেরিতে উঠতে হবে। ওখানে একটা ব্যারিয়ারের কথা বলা হয়েছে, ব্যারিয়ার থাকবে, যদিও এটা একটা কৌশলগতভাবে সমস্যা আছে, তো তারপরও ব্যারিয়ার থাকবে এবং বিআরটিএ ও মালিক সমিতি তারা নিশ্চিত করছে যে যাত্রী সম্পূর্ণ নামিয়ে গাড়ি ফেরিতে উঠতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *