ধর্ষণ মামলার ১৫ কার্যদিবসের তদন্ত গড়িয়ে যায় বছর

ঢাকার পল্লবীতে সাত বছরের শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় উত্তাল দেশ। দ্রুত বিচারের দাবিতে ফুসে উঠেছে বিক্ষুব্ধ জনতা।
পরিস্থিতির চাপে পুলিশ দ্রুত এই মামলাটির চার্জশিট দিলেও ধর্ষণের এমন আরও অনেক ঘটনাই জটিল বিচারিক প্রক্রিয়ায় আটকে যায়। শাস্তি তো দূরে থাক, তদন্ত করতেই পেরিয়ে যায় বছরের পর বছর।

দেশের আলোচিত কয়েকটি ধর্ষণ ও ধর্ষণের পর হত্যা মামলা পর্যালোচনা করলে এমন চিত্রই দেখা যায়। তেমনই একটি ঘটনা সোহাগী জাহান তনুকে ধর্ষণ ও হত্যা।
কুমিল্লা সরকারি ভিক্টোরিয়া কলেজের ইতিহাস বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্রী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনু। ২০১৬ সালের ২০ মার্চ সকালে ময়নামতি ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে সার্জেন্ট জাহিদের বাসায় পড়াতে গিয়েছিলেন।
রাতেও তনু বাড়ি না ফেরায় তার পরিবার খুঁজতে শুরু করে। ওইদিন রাত ১০টার দিকে ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে পাওয়ার হাউসের কাছে ঝোপঝাড়ে তনুর মরদেহ খুঁজে পান বাবা ইয়ার হোসেন।

মেয়েকে ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগে পরদিন কুমিল্লা কোতোয়ালি থানায় মামলা করেন ইয়ার হোসেন। সে সময় সিআইডির তদন্ত টিম তনুর পোশাক থেকে নেওয়া নমুনার ডিএনএ পরীক্ষা করে তিনজন পুরুষের শুক্রাণু পায়। তবে পরে সেই নমুনা আর সন্দেহভাজন কারও ডিএনএর সঙ্গে মিলিয়ে (ক্রস-ম্যাচ) দেখা হয়নি। হত্যাকাণ্ডের ১০ বছর পর চলতি বছরের ৬ এপ্রিল এই মামলায় তিন সন্দেহভাজন—সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সার্জেন্ট জাহিদ, সিনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর রহমান ও সৈনিক শাহিনুল আলমের ডিএনএ নমুনা ক্রস-ম্যাচ করার জন্য আদালতে আবেদন করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।

এরপর গত ২১ এপ্রিল ঢাকার কেরানীগঞ্জ থেকে সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়।

গ্রেপ্তারের পর হাফিজুর রহমানকে রিমান্ডে নেওয়া হলে দেশজুড়ে আবার আলোচনায় আসে তনু হত্যা মামলা। তবে অন্য দুই সন্দেহভাজন এখনো পলাতক। জানা যায়, তাদের একজন সাবেক সেনাসদস্য শাহিনুল আলম দেশ ছেড়ে কুয়েতে পালিয়েছেন। অন্যজন সার্জেন্ট জাহিদ দেশেই পলাতক। তাকে খুঁজছে পিবিআই। তাদের গ্রেপ্তারের পর ডিএনএ নমুনা নেওয়া হবে বলে পিবিআই জানিয়েছে।

এ মামলায় ১০ বছরে ৮১ বার সময় নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে চারটি সংস্থার সাতজন কর্মকর্তা মামলাটি তদন্ত করেছেন। তবে ১০ বছরেও চার্জশিট দাখিল হয়নি।

২০২৫ সালের ৫ মে বান্দরবানের থানচির তিন্দু ইউনিয়নের মংখ্যং পাড়ায় জুমক্ষেতে ধান রোপণ করতে যান চিংমা খিয়াং নামে এক নারী। সন্ধ্যায় বাড়ি না ফেরায় পরিবারের লোকজন খুঁজতে গিয়ে তার মরদেহ পান। স্থানীয়দের অভিযোগ ছিল, রাস্তার কাজে নিয়োজিত তিনজন শ্রমিক তাকে ধর্ষণের পর হত্যা করে। পরদিন নিহতের স্বামী সুমন খিয়াং বাদী হয়ে থানচি থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি ধর্ষণ ও হত্যার মামলা করেন। এ ঘটনার বিচার চেয়ে পাহাড়িরা মানববন্ধন করে। বিচার বিভাগীয় তদন্ত ও দ্রুত বিচার চেয়ে বিবৃতি দেন ৪৭৫ জন বিশিষ্ট নাগরিক। তবে ঘটনার এক বছর পার হলেও এখনো মামলার চার্জশিট দাখিল হয়নি।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধিত ২০২৬)-এর ১৮ ধারায় তদন্তের প্রাথমিক সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ১৫ কার্যদিবস।

এই ধারায় বলা হয়েছে, ‘‘(১) ফৌজদারি কার্যবিধিতে ভিন্নতর যাহা কিছুই থাকুক না কেন, এই আইনের অধীন কোনো অপরাধের তদন্ত-
(ক) অভিযুক্ত ব্যক্তি অপরাধ সংঘটনের সময়ে হাতেনাতে পুলিশ কর্তৃক ধৃত হইলে বা অন্য কোনো ব্যক্তি কর্তৃক ধৃত হইয়া পুলিশের নিকট সোপর্দ হইলে, তাহার ধৃত হইবার তারিখ হইতে পরবর্তী পনের কার্যদিবসের মধ্যে সম্পন্ন করিতে হইবে; অথবা
(খ) অভিযুক্ত ব্যক্তি অপরাধ সংঘটনের সময়ে হাতেনাতে ধৃত না হইলে তাহার অপরাধ সংঘটন সংক্রান্ত প্রাথমিক তথ্য প্রাপ্তি বা, ক্ষেত্রমত, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বা তাহার নিকট হইতে ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা অথবা ট্রাইব্যুনালের নিকট হইতে তদন্তের আদেশ প্রাপ্তির তারিখ হইতে পরবর্তী ত্রিশ কার্যদিবসের মধ্যে সম্পন্ন করিতে হইবে।’’

(২) কোনো যুক্তিসংগত কারণে উপ-ধারা (১)-এ উল্লিখিত সময়ের মধ্যে তদন্তকার্য সমাপ্ত করা সম্ভব না হইলে তদন্তকারী কর্মকর্তা তদন্তের মেয়াদ শেষ হইবার পূর্বে কেস ডায়েরিসহ বিলম্বের কারণসংবলিত লিখিত প্রতিবেদন ট্রাইব্যুনালে বা, ক্ষেত্রমত, ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট উপস্থাপন করিবেন এবং ট্রাইব্যুনাল বা ম্যাজিস্ট্রেট সন্তুষ্ট হইলে তদন্তকারী কর্মকর্তা পরবর্তী পনেরো কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত সম্পন্ন করিবেন; তবে শর্ত থাকে যে, যেসব মামলার তদন্তে ট্রাইব্যুনাল বা, ক্ষেত্রমত, ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমোদন সাপেক্ষে ডিএনএ পরীক্ষা আবশ্যক, সেসব মামলার তদন্তের মেয়াদ ট্রাইব্যুনাল বা, ক্ষেত্রমত, ম্যাজিস্ট্রেট ন্যূনতম প্রয়োজনীয় সময় পর্যন্ত বর্ধিত করিতে পারিবে।’’

মূলত, এসব অপরাধে ডাক্তারি পরীক্ষার প্রতিবেদন, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন ও ডিএনএ প্রতিবেদন পেতে বড় একটি সময় পার হয়ে যায়। এসব প্রতিবেদন পেতে ক্ষেত্রবিশেষে তিন থেকে ছয় মাসের মতো সময় লেগে যায়। এসব প্রতিবেদনসহ অন্যান্য প্রাসঙ্গিক কাজ শেষে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে একটা বড় সময় তদন্তেই শেষ হয়ে যায়।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় অধ্যাদেশ জারি করে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ১৮ ধারায় সংশোধন আনা হয়। চলতি বছর সেই অধ্যাদেশটি আইনে পরিণত করা হয়। এই আইনে সংঘটিত অপরাধের মামলায় আসামি গ্রেপ্তার থাকলে পনের কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত শেষ করতে বলা হয়েছে। কিন্তু আইনের সঙ্গে বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে বিভিন্ন অপরাধে গত বছরের এপ্রিল থেকে চলতি এপ্রিল পর্যন্ত রাজধানীর ৫০ থানায় মোট দুই হাজার ৩৮টি মামলা দায়ের হয়। তবে আইনে নির্ধারিত ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে কোনো তদন্ত প্রতিবেদন জমা হয়নি। এই সময়ে ১ হাজার ২৮৮টি মামলার তদন্ত শেষ করে আদালতে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। এখনও তদন্তাধীন রয়েছে ৭৫০টি মামলা।

তদন্তে এই বিলম্ব যে সবসময় অবহেলা, তা নয়; পেছনে বাস্তব কারণও থাকে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট এইচ. এম. মাসুম বলেন, ডাক্তারি পরীক্ষা, ডিএনএ প্রতিবেদন ও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন যেসব বিষয়ে থাকে, সেই তদন্তে কিছু জটিলতা থাকে। এসব প্রতিবেদন আসার জন্য অপেক্ষা করতে হয়। প্রতিবেদন প্রাপ্তির পর তার সঙ্গে অন্যান্য সাক্ষ্যপ্রমাণ ও আসামির স্বীকারোক্তি থাকলে সেগুলোর সঙ্গে মিলাতে হয়। মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সাক্ষীদের জবানবন্দি গ্রহণ করতে হয়। এরপর তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। আইনে যেরকম সরলভাবে বলা আছে, সবগুলো বিষয় সমন্বয় এতটা সরলভাবে হয় না।

তবে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা তদন্তের জন্য পৃথক বিশেষায়িত সেল থাকলে তদন্তের গতি ও ফলাফল ভালো হবে বলেও মনে করেন রাষ্ট্রপক্ষের এই আইনজীবী। তিনি বলেন, দেখা যায় থানা পুলিশ বেশিরভাগ মামলা তদন্ত করে। তারা তদন্তের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বেও নিয়োজিত থাকে। বিভিন্ন ধরনের অপরাধ ও তদন্ত করতে গিয়ে আলাদাভাবে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার ঘটনাকে ফোকাস করা অনেক ক্ষেত্রে সম্ভব হয় না। তাই সমস্ত ডাক্তারি পরীক্ষা ও ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য বিশেষজ্ঞ ও ল্যাব সুবিধাসহ একটি বিশেষায়িত পৃথক তদন্ত সেল গঠন খুবই প্রয়োজন।

জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) এস. এন. নজরুল ইসলাম বলেন, তদন্তের যে সময়সীমা আছে, সেটা পুলিশ মানার চেষ্টা করে। যখন তদন্ত কর্মকর্তা তার কাজ শেষ করতে না পারেন, তখন আদালতে আবেদন দিয়ে সময় বাড়িয়ে নেন। বিশেষ ক্ষেত্রে বা চাঞ্চল্যকর মামলার ক্ষেত্রে পুলিশ দ্রুততম সময়ের মধ্যেই প্রতিবেদন দেওয়ার চেষ্টা করে। তবে সাধারণভাবে যে অপরাধ হয়, সেই তুলনায় পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা না থাকায় ধারাবাহিকভাবে এসব ডাক্তারি বা ফরেনসিক প্রতিবেদন পেতে একটা লম্বা সময় চলে যায়। সেই বিলম্বের প্রভাব চার্জশিট বা ফাইনাল রিপোর্ট দাখিলেও পড়ে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *