মীরসরাইতে বিএনপির ঘরোয়া সংঘাত: মনোনয়ন ঘিরে উত্তপ্ত হচ্ছে মাঠ

ওমর ফারুক

চট্টগ্রামের উত্তর প্রান্তে বঙ্গোপসাগরীয় উপকূলঘেঁষা জনপদ মীরসরাই। রাজনৈতিকভাবে উত্তেজনাপূর্ণ, অর্থনৈতিকভাবে সম্ভাবনাময় এবং কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি উপজেলা। এই উপজেলা দুইটি পৌরসভা ও ১৬টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত। দীর্ঘদিন ধরে এটি উত্তর চট্টগ্রামের রাজনীতিতে বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।

এ আসনটি চট্টগ্রাম-১ (মীরসরাই) নির্বাচনী এলাকা। আসন্ন জাতীয় নির্বাচন ঘিরে এখানে ইতোমধ্যে তীব্র উত্তেজনা ও প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে বিএনপি ঘরানার রাজনীতিতে। মনোনয়নপ্রত্যাশীদের তালিকা ক্রমেই বড় হচ্ছে, আর সেই সঙ্গে বাড়ছে দলীয় বিভাজন, স্থানীয় সমীকরণ ও অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন।

মনোনয়নপ্রত্যাশীদের ভিড়ে উত্তপ্ত মীরসরাই

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীদের তালিকায় এখন একাধিক আলোচিত নাম। দলীয় পর্যবেক্ষকদের মতে, মীরসরাইয়ে যারা মাঠে সক্রিয় রয়েছেন, তাদের মধ্যে অনেকেই ইতোমধ্যে প্রাথমিক নির্বাচনী প্রচার ও সাংগঠনিক তৎপরতা শুরু করেছেন।

সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকায় রয়েছেন:
নুরুল আমিন- চট্টগ্রাম উত্তরজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক ও মীরসরাই উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান।
নুরুল আমিন- চট্টগ্রাম উত্তরজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক।
প্রফেসর কামাল উদ্দিন চৌধুরী- চেয়ারম্যান ক্লিপটন গ্রুপ, কেন্দ্রীয় সদস্য বিএনপি জাতীয় নির্বাহী কমিটি।
শাহীদুল ইসলাম চৌধুরী- মীরসরাই উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক।
আব্দুল আউয়াল চৌধুরী, সাবেক আহ্বায়ক, মিরসরাই উপজেলা বিএনপি।
এমডিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী- ক্লিপটন গ্রুপের সিইও, ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ক ও প্রভাবসম্পন্ন এক নতুন মুখ।
মনিরুল ইসলাম ইউসুফ- বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের সাবেক কেন্দ্রীয় সহসভাপতি।
পারভেজ সাজ্জাদ- যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী রাজনৈতিক কর্মী, যিনি প্রবাসে থেকেও দীর্ঘদিন ধরে এলাকার সামাজিক ও মানবিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত।
ইঞ্জিনিয়ার ফখরুল আলম- সভাপতি, জাতীয়তাবাদী টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার্স এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ, (জেটেব)।
জিয়াদ আমিন খান- সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা মরহুম মেজর জেনারেল (অব.) জেড এ খানের পুত্র এবং উপজেলা বিএনপির সক্রিয় সদস্য।

আইরিন খন্দকার ও এমদাদ খন্দকার- মীরসরাই বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য মরহুম ওবায়দুল হক খন্দকারের সন্তান, বর্তমানে আমেরিকা প্রবাসী।
এই তালিকায় স্থানীয় ও প্রবাসী-দুই প্রজন্মের নেতৃত্বই দেখা যাচ্ছে। তবে দলের ভেতরে মতভেদও ক্রমেই প্রকাশ্য হয়ে উঠছে।

দলীয় শৃঙ্খলা ও মনোনয়ন যুদ্ধ
উত্তর চট্টগ্রামের রাজনীতিতে বরাবরই মনোনয়নপ্রাপ্তি একটি বড় প্রতিযোগিতা। কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের আগে থেকেই স্থানীয় পর্যায়ে দলীয় কর্মীদের মধ্যে দ্বন্দ্ব ও বিভাজন দেখা দিচ্ছে।
একই দলীয় পতাকার নিচে একাধিক প্রার্থীর কর্মসূচি, শোডাউন, এমনকি স্থানীয় পর্যায়ে “ফ্র্যাচকশন” বা ভাগে ভাগে কাজ করার প্রবণতা এখন প্রকাশ্যে।

রাজনীতির পর্যবেক্ষকদের মতে, দলীয় হাইকমান্ড এবার মাঠপর্যায়ের জনপ্রিয়তা ও সাংগঠনিক আনুগত্যকে বেশি গুরুত্ব দেবে। যারা তৃণমূলে সংগঠনকে টিকিয়ে রেখেছেন, যারা জনতার সঙ্গে সংযোগ বজায় রেখেছেন তাদের পক্ষেই ঝুঁকতে পারে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত।

মীরসরাইয়ের ভোটার বেস ও স্থানীয় প্রত্যাশা

মীরসরাই একটি বৃহৎ জনবহুল ও অর্থনৈতিকভাবে সম্ভাবনাময় উপজেলা। শিল্পনগর, পর্যটন কেন্দ্র, কৃষি-ভিত্তিক অর্থনীতি এবং প্রবাসী আয়ের ওপর নির্ভরশীল এই জনপদে ভোটারদের প্রধান প্রত্যাশা-নিরাপদ জীবন, কর্মসংস্থান ও উন্নয়ননির্ভর রাজনীতি।

ভূমি ও জনগোষ্ঠীর বৈচিত্র্যের কারণে এখানে প্রত্যেক ইউনিয়নেই ভোটের হিসাব আলাদা। দক্ষিণাঞ্চলে শিল্পাঞ্চল ও ব্যবসায়ী শ্রেণি প্রভাবশালী, আর উত্তরাঞ্চলে কৃষিজীবী ও প্রবাসী পরিবারের ভোটের সংখ্যা বেশি। ফলে মাঠে উপস্থিতি, ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতি-এখানে প্রার্থীর সবচেয়ে বড় পুঁজি।

প্রবাসী প্রার্থীদের উত্থান: অর্থ, যোগাযোগ ও প্রভাব
প্রবাসী প্রার্থীদের উত্থান মীরসরাই রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। পারভেজ সাজ্জাদ, আইরিন খন্দকার, এমদাদ খন্দকার তাদের রয়েছে অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা, প্রবাসী নেটওয়ার্ক এবং রাজনৈতিক আগ্রহ। তবে তাদের চ্যালেঞ্জ হলো, স্থানীয় রাজনীতিতে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ ও দীর্ঘমেয়াদি সংযোগের ঘাটতি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, “প্রবাসে অর্জিত পরিচিতি ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা স্থানীয় জনপ্রিয়তার বিকল্প নয়” তৃণমূলের আস্থা অর্জনই তাদের জন্য এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

স্বাধীন নির্বাচন ও মানুষের বিশ্বাস
বিগত কয়েকটি নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রশ্নে মীরসরাইসহ উত্তর চট্টগ্রামের মানুষ আস্থাহীনতায় ভুগেছে। তবে তারা এখনো আশাবাদী-যদি অবাধ, নিরপেক্ষ নির্বাচন হয়, তাহলে তারা তাদের মত প্রকাশ করবে, যাকে যোগ্য মনে করবে তাকেই ভোট দেবে।
এই বিশ্বাসই বিএনপির জন্য আশার আলো-কিন্তু সেই আস্থা ফিরে পেতে হলে দলকে আগে নিজের ভেতরে ঐক্য ফিরিয়ে আনতে হবে।

সম্ভাবনার মঞ্চে স্থানীয় নেতৃত্ব
বিএনপি হাইকমান্ডের সিদ্ধান্তই শেষ কথা, তবে স্থানীয় পর্যায়ে জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণ করবে আসন্ন নির্বাচনের গতিপথ।
নুরুল আমিন চেয়ারম্যান দীর্ঘদিন তৃণমূলের রাজনীতিতে সক্রিয়, মাঠে আন্দোলনে উপস্থিত, স্থানীয় সংগঠন ও নেতাকর্মীদের মধ্যে গ্রহণযোগ্য।
অন্যদিকে, প্রবাসী প্রার্থীরা নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক চেতনা ও অর্থনৈতিক শক্তি নিয়ে মাঠে নেমেছেন।
এভাবে মীরসরাই এখন দুই ধারার রাজনীতিতে বিভক্ত, একদিকে স্থানীয় নেতৃত্বের ঐতিহ্য, অন্যদিকে প্রবাসী প্রভাব ও আধুনিক রাজনীতির ছোঁয়া।
বিএনপির জন্য পরীক্ষা মীরসরাই
মীরসরাই এখন শুধু একটি সংসদীয় আসন নয়, বরং উত্তর চট্টগ্রামের রাজনীতির পরীক্ষাগার। এখানে সংঘর্ষ হচ্ছে দুটি রাজনৈতিক ধারণার। একটি সংগঠিত তৃণমূল রাজনীতি, অন্যটি বৈশ্বিক প্রভাব ও নতুন প্রজন্মের প্রবাসী নেতৃত্ব।
শেষ পর্যন্ত, জয় হবেন তিনিই- যিনি ভোটারের দরজায় পৌঁছাতে পারবেন, মানুষের ভাষায় কথা বলবেন, এবং দলের অভ্যন্তরে ঐক্য আনতে সক্ষম হবেন।
কারণ মীরসরাইয়ের মানুষ প্রতিশ্রুতি নয়, চায় বাস্তব উপস্থিতি-চায় এমন একজন নেতা, যিনি সত্যিই তাদের প্রতিনিধিত্ব করবেন। দৃঢ়ভাবে বলতে পারবেন “আমি শুধু প্রার্থী নই, আমি আপনার প্রতিনিধি।”

ওমর ফারুক, গণমাধ্যম কর্মী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *