আগুনের ভেতর যারা ঢুকে যায়

ওমর ফারুক

আগুন জ্বলে উঠলে শহর থমকে যায়। মানুষ দৌড়ে পালায় নিরাপদ দূরত্বে, ছুটে যায় ছাদে, জানালায়, বা রাস্তায়। কিন্তু সেই মুহূর্তে একদল মানুষ উল্টো দিক থেকে দৌড়ে আসে, তাদের নাম ফায়ার ফাইটার।

তারা জানে না সামনে কী আছে, জানে না গ্যাস লিক হয়েছে কি না, ভবনটা ভেঙে পড়বে কি না, তবু তারা যায়। কারণ তাদের কাছে আগুন নিভানো মানে শুধু পানি ঢালা নয়, এটা এক ধরনের প্রার্থনা—জীবন বাঁচানোর প্রার্থনা।

ঢাকার সংকীর্ণ গলির ভেতর, পুরান ঢাকার রাসায়নিক গুদামে, বা চট্টগ্রামের কোনো ফ্যাক্টরিতে যখন সাইরেন বাজে, তখন তারা দৌড়ে যায় শ্বাসরোধী অন্ধকারে। এক হাতে ভারী পাইপ, অন্য হাতে জীবন-মৃত্যুর ভার।

তাদের কেউ টেলিভিশনের তারকা নয়, কেউ ফেসবুকের হিরো নয়, কিন্তু প্রত্যেকেই শহরের অন্তর্গত এক এক জন নীরব নায়ক।

তাদের মুখে কালো ধোঁয়া, চোখে লাল আভা, আর ভেতরে জ্বলতে থাকে একটাই বাক্য, “আমরা বাঁচাতে এসেছি, নিজেকে হারিয়ে ফেললেও।”

বনানীর এফআর টাওয়ারের আগুন, নারায়ণগঞ্জের কেমিক্যাল বিস্ফোরণ, সীতাকুণ্ডের কনটেইনার ডিপো। প্রতিবারই আগুন নেভাতে গিয়ে কেউ না কেউ চিরতরে ফিরে আসেনি। তাদের নাম হয়তো কয়েকদিনের জন্য সংবাদে উঠে আসে, কিন্তু খুব দ্রুত আমরা ভুলে যাই। তাদের সন্তানদের মুখে এখনো ঝলসে থাকা ভয়, তাদের স্ত্রীর ঘরে আজও পোড়া বুটজোড়া।

আমরা যারা বেঁচে থাকি, আমরা ভুলে যাই- এই শহরের প্রতিটি নিশ্বাসের পেছনে কারও না কারও জীবন পুড়ে গেছে।

ফায়ার ফাইটাররা আগুনের সঙ্গে যুদ্ধ করেন, কিন্তু তাদের সবচেয়ে কঠিন লড়াই রাষ্ট্রের অবহেলার সঙ্গে। তাদের সরঞ্জাম পুরনো, অক্সিজেন মাস্কে লিক, হেলমেট ভাঙা, ইউনিফর্ম ছেঁড়া। একটি হাই-রাইজ ভবনে আগুন লাগলে তারা প্রায়ই উঠে যায় এমন উচ্চতায় যেখানে পৌঁছানোর জন্যই যথেষ্ট সরঞ্জাম নেই।

আর ফিরে আসলে? কেউ জিজ্ঞেস করে না তারা কেমন আছে। তাদের মানসিক ট্রমা, ভয়, অপরাধবোধ, সবকিছু মিশে যায় এক নিঃশব্দ ক্লান্তিতে। রাষ্ট্রের চোখে তারা “চাকুরিজীবী”,
কিন্তু বাস্তবে তারা বেঁচে থাকা বীর।

বিশ্বজুড়ে ফায়ার ফাইটাররা এখন শুধু আগুন নেভান না; তারা উদ্ধার করেন, প্রেরণা দেন, মানবতার এক সেতুবন্ধন তৈরি করেন। অস্ট্রেলিয়ার বনাঞ্চল থেকে শুরু করে ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্র—
যেখানেই জীবন বিপন্ন, সেখানেই ফায়ার ফাইটার মানে একটাই কথা মানবতার শেষ রক্ষাকবচ।

বাংলাদেশেও তাদের সেই মর্যাদা পাওয়া উচিত। তাদের সাহসের গল্প পাঠ্যবইয়ে থাকা উচিত,
স্কুলের শিশুদের শেখানো উচিত, আগুন থেকে পালায় সবাই, কিন্তু কিছু মানুষ আগুনের দিকেই হাঁটে।

আগুন নেভে, ধোঁয়া মুছে যায়, কিন্তু ফায়ার ফাইটারদের চোখে থাকে অন্য এক দগ্ধতা। তারা দেখেছেন শিশুর কান্না, বৃদ্ধের চিৎকার, অবুঝ প্রাণের নিঃশেষ হয়ে যাওয়া, তবু পরদিন আবার ডিউটিতে ফেরেন, কারণ তাদের কাজ থেমে থাকে না।

তাদের কাউন্সেলিং দরকার, তাদের বিশ্রাম দরকার, সবচেয়ে বেশি দরকার—সম্মান।
ফায়ার ফাইটারদের কাজ শুধুই কর্তব্য নয়, এটা এক নৈঃশব্দ্যের কবিতা, যেখানে মৃত্যু, সাহস আর ভালোবাসা একসাথে নাচে।

যখন সবাই পালায়, তারা তখন আগুনের বিপরীতে হাঁটে, একজন কবির মতো, যে জানে শেষ পর্যন্ত শব্দ পোড়ে, তবু কবিতা লেখা থামে না।

ওমর ফারুক
গণমাধ্যম কর্মী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *