তারেক রহমানের সাক্ষাৎকার: নির্বাসন থেকে নেতৃত্বে ফিরে আসার রূপরেখা

ওমর ফারুক

দুই দশক পর কোনো গণমাধ্যমের সামনে সরাসরি মুখোমুখি হলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। লন্ডন থেকে ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হয়ে বিবিসি বাংলার সম্পাদক মীর সাব্বির ও সিনিয়র সাংবাদিক কাদির কল্লোলের প্রশ্নের জবাবে তিনি শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য দেননি উন্মোচন করেছেন নিজের রাজনৈতিক দর্শন, ব্যক্তিগত উপলব্ধি এবং ভবিষ্যৎ রাজনীতির দিকনির্দেশনাও।

এই সাক্ষাৎকার কেবল একজন নির্বাসিত রাজনীতিকের মতামত নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে আসন্ন রূপান্তরের এক ঘোষণাপত্রসদৃশ দলিল বলেই মনে হয়।

তারেক রহমানের কণ্ঠে এক অদ্ভুত আত্মবিশ্বাস লক্ষ্য করা গেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি সতর্ক সমর্থন জানালেও তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, তাদের সফলতা নির্ভর করবে “কতটা সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও স্বাধীন নির্বাচন তারা দিতে পারেন” এই একবাক্যে তিনি আবারও নিজেকে গণতান্ত্রিক পরিসরে স্থাপন করেছেন।

এই বক্তব্য শুধু কূটনৈতিক শালীনতা নয়, বরং রাজনৈতিক কৌশল। তিনি একদিকে বর্তমান সরকারের প্রতি প্রকাশ্য বিরোধিতা থেকে বিরত থেকেছেন, অন্যদিকে রাজনৈতিক ন্যায্যতা ও জনগণের ম্যান্ডেটের প্রশ্নে দৃঢ় অবস্থানও দেখিয়েছেন।

একটি ভারসাম্যপূর্ণ সুর যেখানে তারেক রহমান এখন নিজেকে “কনফ্রন্টেশনাল” নয়, বরং “রিজেনারেটিভ” রাজনীতিক হিসেবে তুলে ধরতে চাইছেন।

বিবিসির প্রশ্নে যখন এক এগারো প্রসঙ্গ ওঠে, তখন তার সংক্ষিপ্ত উত্তর- “আমরা তো সামনে যেতে চাই, আপনি পিছনে কেন যাচ্ছেন?”

এই বাক্য শুধু তর্ক নয় এটি প্রতীকী। তারেক রহমান অতীতকে অস্বীকার করেননি, বরং অতীতের শিক্ষা নিয়ে সামনে এগোনোর ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি এক এগারো সরকারকে বলেছেন “অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত”, কিন্তু সেখানে থেমে থাকেননি বরং বলেছেন, “আমাদের দেশকে সামনে নিতে হবে।”

এই বক্তব্যে লুকিয়ে আছে এক মনস্তাত্ত্বিক পুনর্জন্ম—অতীতের ক্ষত নয়, ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতিই এখন তার রাজনীতির ভিত্তি।

সাক্ষাৎকারের সবচেয়ে আলোচিত অংশ ছিল সংস্কার ও জুলাই সনদ নিয়ে বিএনপির অবস্থান।
বেশ কয়েকটি দল যেমন ‘এক ব্যক্তি তিন পদে না থাকার’ দাবি তুলেছে, বিএনপি সেখানে ‘নোট অফ ডিসেন্ট’ দিয়েছে।

তারেক রহমানের যুক্তি- “দ্বিমত থাকাটাই তো গণতন্ত্র।”

এটি একদিকে তাঁর দলের স্বাতন্ত্র্য রক্ষা, অন্যদিকে গণতন্ত্রের মূল সারবত্তা পুনঃসংজ্ঞায়ন।
তাঁর বক্তব্যে বোঝা যায়, তিনি এখন এমন এক রাজনীতি চান যেখানে সবাই একমত হবে না, বরং ভিন্নমতের সহাবস্থানই হবে শক্তিশালী রাষ্ট্রের চাবিকাঠি।

তবে সমালোচকরা বলতেই পারেন এই অবস্থান সংস্কারের গতিকে ধীর করতে পারে।
কিন্তু রাজনীতিতে কখনও ধীর পদক্ষেপই হয় দূরগামী পদক্ষেপ।

তারেক রহমানের কূটনৈতিক অবস্থান ছিল স্পষ্ট ও প্রতীকী- “সবার আগে বাংলাদেশ।” এই স্লোগান পশ্চিমা রাজনীতির “আমেরিকা ফার্স্ট”-এর অনুকরণ নয়, বরং এর নিজস্ব জাতীয়তাবাদী রূপ।

তিনি ভারত প্রসঙ্গে বলেছেন, “আমি আমার পানির হিস্যা চাই, ফেলানীর মতো দৃশ্য আর দেখতে চাই না।”

এই কথাগুলো শুধু কূটনৈতিক বিবৃতি নয়; এগুলো বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের আবেগের প্রতিফলন। তিনি ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের “উষ্ণতা নয়, মর্যাদাপূর্ণ পারস্পরিকতা” চান। এমন বার্তা দিয়েছেন।

একইসাথে তিনি বলেন, “যদি ভারত স্বৈরাচারকে আশ্রয় দেয়, তাহলে বাংলাদেশের মানুষের বিরাগভাজন হবে।”

এই বক্তব্য রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল হলেও এতে লুকিয়ে আছে এক বাস্তববাদী বার্তা। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে জনগণই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়, বাইরের প্রভাব নয়।

১৭ বছরের প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি বললেন, “এই দেশ (যুক্তরাজ্য) থেকে যা ভালো দেখেছি, শিখেছি, আমি চাই সেটা প্রয়োগ করতে।”

এটি নিছক সৌজন্য নয়, বরং নেতৃত্বের নতুন সংজ্ঞা। তিনি নিজের স্ত্রী ও সন্তানকে ধন্যবাদ দিয়েছেন, দলের কর্মীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন এতে বোঝা যায়, তাঁর নেতৃত্ব এখন ব্যক্তিকেন্দ্রিক নয়, বরং সহযোগিতামূলক নেতৃত্বের দিকে অগ্রসর।

তিনি যখন বলেন, “অভিযোগ থাকতেই পারে, কিন্তু সুযোগ পেলে আমি প্রমাণ করব” তখন সেটি এক রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি, যা আগের চেয়ে অনেক বেশি পরিণত ও সংযত।

তারেক রহমান বিএনপির ঐতিহ্য তুলে ধরেছেন, গার্মেন্ট শিল্প, প্রবাসী আয়, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা ও বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার। এগুলো স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি একধরনের ‘ঐতিহাসিক বৈধতা’ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছেন।

তবে এবার তিনি আরও একধাপ এগিয়েছেন, তিনি বলেন, ভবিষ্যৎ বিএনপি হবে “গণতন্ত্রের শক্তিশালী বুনিয়াদ ও জবাবদিহিতার দল”। এটি শুধু দলের জন্য নয়, বাংলাদেশের রাজনীতির জন্যও এক নতুন প্রতিশ্রুতি।

বিবিসির শেষ প্রশ্নে তাঁর মুখে যে হাসি, সেটিই হয়তো সাক্ষাৎকারের সবচেয়ে মানবিক মুহূর্ত।

“বিড়ালটি আমার মেয়ের বিড়াল… তবে এখন সবারই হয়ে গেছে।”

এই অংশটি তাঁর রাজনৈতিক ইমেজের এক অন্য দিক উন্মোচন করে, একজন কৌশলী রাজনীতিকের ভেতরে থাকা সংবেদনশীল মানুষটিকে। পোষা প্রাণী, পরিবার, প্রকৃতি এই বিষয়গুলো নিয়ে তাঁর মন্তব্য দেখায় যে, তিনি এখন রাজনীতিকে শুধুমাত্র ক্ষমতার নয়, মানবিকতার সম্প্রসারণ হিসেবেও দেখতে চান।

এই দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে তারেক রহমান নিজেকে নতুনভাবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। একজন নির্বাসিত রাজনীতিক থেকে একজন প্রস্তুত নেতা, একজন প্রবাসী থেকে একজন পুনরাগামী রাষ্ট্রনির্মাতার পথে।

তিনি এখন সংঘর্ষ নয়, সংলাপের ভাষায় কথা বলেন; প্রতিশোধ নয়, পুনর্গঠনের রাজনীতি করতে চান। এই সাক্ষাৎকার তাই কেবল এক ব্যক্তির বক্তব্য নয়, এটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের প্রাককথন।

ওমর ফারুক
গণমাধ্যম কর্মী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *