শিক্ষকদের আন্দোলন: বেতন নয়, মর্যাদার দাবিতে এক সংগ্রাম

ওমর ফারুক

“আমরা পেটের ভাত চাই না, মর্যাদার স্বীকৃতি চাই” এই এক বাক্যে সারা দেশের শিক্ষকদের প্রতিবাদের সারমর্ম ধরা পড়ে।

রাজধানী ঢাকার শাহবাগ, জাতীয় প্রেসক্লাব, কিংবা মফস্বলের শহর একই চিত্র চারদিকে। হাতে ব্যানার, চোখে ক্লান্তি, মুখে দৃঢ়তা। শিক্ষকেরা আজ রাজপথে। কেউ বলছেন, ‘আমরা আর ভিক্ষা চাই না, প্রাপ্যটা চাই।’
বছরের পর বছর ধরে অবহেলায় ভরা সেই শিক্ষাখাত এবার যেন নিজের অস্তিত্ব ফিরে পেতে চাইছে এক দুঃসহ প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে।

আন্দোলনের পটভূমি ও মূল দাবি

এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা রাষ্ট্রীয় বেতন কাঠামোর বাইরে থাকলেও সরকারি সহায়তায় চলেন। দীর্ঘদিন ধরে তারা দাবি করে আসছেন ঘরভাড়া ও চিকিৎসা ভাতা বৃদ্ধির।
বর্তমানে তাদের তিনটি প্রধান দাবি- ঘরভাড়া ভাতা ২০ শতাংশে উন্নীত করা (ন্যূনতম ৩ হাজার টাকা), চিকিৎসা ভাতা ১হাজার ৫০০ টাকায় উন্নীত করা, উৎসব ভাতা বেসিকের ৭৫ শতাংশ করা।

সরকার যখন মাত্র ৫ শতাংশ বৃদ্ধির প্রস্তাব দেয়, তখনই শিক্ষক সমাজ তা “অমর্যাদাকর” বলে প্রত্যাখ্যান করে রাজপথে নামে। এখন তারা বলছেন, “২০ মানে ২০এর কম কিছু নয়।”

শিক্ষক নয়, রাষ্ট্রের বিবেক রাজপথে

এই আন্দোলন নিছক অর্থের লড়াই নয়। এটি শিক্ষক সমাজের মর্যাদা ও জীবনযুদ্ধের প্রতিফলন। একজন শিক্ষক যখন মাস শেষে পরিবারের ওষুধ কেনার টাকা জোগাতে পারেন না, তখন শিক্ষা আর পেশা থাকে না, তা হয়ে ওঠে টিকে থাকার সংগ্রাম।

এক শিক্ষক বললেন, “আমরা জ্ঞান দিই, কিন্তু নিজের জীবন চালাতে অজ্ঞান হয়ে যাই।”
রাষ্ট্রের কাছে এ এক ভয়াবহ সংকেত, যেখানে জ্ঞানের কারিগর নিজেই জীবনের হিসাব মেলাতে ব্যর্থ।

রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার: শিক্ষা নাকি প্রদর্শন?
বাংলাদেশে প্রতি বছর বাজেট বাড়ছে, কিন্তু শিক্ষা খাতের বরাদ্দ কমছে। প্রশাসন, অবকাঠামো ও প্রকল্পে খরচ বাড়ছে বহুগুণে, অথচ শিক্ষক সমাজ রয়ে গেছেন অনাদৃত।
প্রশ্ন জাগে-রাষ্ট্র কি এখনো শিক্ষককে জাতির নির্মাতা মনে করে, নাকি তাকে এক “বেতনভুক্ত কর্মচারী” হিসেবে দেখছে?

শিক্ষককে উপেক্ষা মানে আসলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি অবহেলা। কারণ শিক্ষা খাতের অবনতি মানে দেশের নৈতিক মেরুদণ্ডের ভাঙন।

আন্দোলন ও প্রশাসনিক প্রতিক্রিয়া

সরকারি অফিস থেকে অনুরোধ এসেছে আলোচনার। কিন্তু আন্দোলনরত শিক্ষকরা বলছেন, “বক্তৃতা নয়, গেজেট চাই।”

রাজপথে কখনো জলকামান, কখনো বাধা, তবু আন্দোলন থামেনি। শিক্ষক সমাজ এখন আর ‘নরম প্রতিবাদ’-এর পর্যায়ে নেই, তারা চাইছেন ন্যায্যতার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি।

সমাধানের পথ ও বাস্তবায়নের প্রস্তাব
এই অচলাবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য প্রয়োজন পারস্পরিক দায়িত্ববোধ ও দ্রুত পদক্ষেপ।
• সরকারের পক্ষ থেকে দ্রুত গেজেট প্রকাশ— ঘরভাড়া ও চিকিৎসা ভাতা বৃদ্ধির বাস্তব ঘোষণা।
• শিক্ষকদের মর্যাদা পুনর্গঠন নীতি— যাতে সরকারি কর্মকর্তাদের মতো তারা সামাজিক ও আর্থিক সুরক্ষা পান।
• দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষা সংস্কার রোডম্যাপ, যাতে ভবিষ্যতে এই ধরনের আন্দোলনের প্রয়োজন না পড়ে।
• মিডিয়া ও নাগরিক সমাজের সহমর্মিতা— কারণ শিক্ষক আন্দোলন ব্যর্থ হলে, পরাজিত হয় গোটা সমাজই।

এই আন্দোলন শুধুই অর্থের নয়, এটি সম্মানের পুনরুদ্ধারের যুদ্ধ। শিক্ষকেরা রাজপথে নেমেছেন কারণ তারা আর নীরব থাকতে চান না। যখন শিক্ষক রাজপথে, তখন আসলে জাতির বিবেক রাজপথে থাকে।

রাষ্ট্র যদি শিক্ষকের প্রতি শ্রদ্ধা হারায়, তাহলে একদিন শিক্ষার্থীও হারাবে শ্রদ্ধা-আর তখন ভেঙে পড়বে পুরো জাতির নৈতিক ছাদ।

লেখক: ওমর ফারুক, গণমাধ্যম কর্মী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *