বৈশ্বিক সংকটে দেশীয় বাজারে কম মুনাফার নীতি সময়ের দাবি


মোঃ আমিনুল ইসলাম

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ওপর যৌথ হামলা চালানোর পর মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা দ্রুত বেড়ে যায়। ইরানের পালটা হামলার মধ্য দিয়ে সংঘাত ৪০তম দিন অতিক্রম করেছে, তবুও এখনো যুদ্ধ থামার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। এই দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের প্রভাব শুধু আঞ্চলিক নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীতে ইরানের প্রভাব বিস্তারের কারণে জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাস রপ্তানি সীমিত হয়ে পড়ায় জ্বালানির দাম বেড়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশেও। এলএনজি, পেট্রোল, ডিজেল ও অকটেনের মূল্যবৃদ্ধি ইতোমধ্যেই দেশের শিল্প-কারখানা, পণ্য পরিবহন এবং সার্বিক অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করছে।

এই বাস্তবতায় দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার ব্যয়—সব মিলিয়ে জনজীবনে এক ধরনের অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে শুধু সরকারের একক উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; ব্যবসায়ী ও সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা জরুরি।

বর্তমান সংকটে ‘কম মুনাফা, বেশি স্বস্তি’—এই নীতিকে সামনে আনা সময়ের দাবি। বাজারের ক্রয়ক্ষমতা যখন কমে যায়, তখন অতিরিক্ত মুনাফার চেষ্টা দীর্ঘমেয়াদে ব্যবসার জন্যও ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়। বরং সহনশীল মূল্যনীতি গ্রহণ করলে গ্রাহকের আস্থা বাড়ে এবং বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরে আসে।

প্রথমত, মোবাইল অপারেটর ও ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত সেবামূল্য কিছুটা সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আসা। ডিজিটাল যুগে ইন্টারনেট আর বিলাসিতা নয়, এটি মৌলিক প্রয়োজন। একইভাবে শিক্ষা খাতে ভর্তি ও টিউশন ফি সাময়িকভাবে কমানো বা কিস্তির সুযোগ সৃষ্টি করা গেলে তা অনেক পরিবারের জন্য স্বস্তির কারণ হবে।

স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। চিকিৎসকের পরামর্শ ফি এবং হাসপাতালের পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যয় অনেকের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। এই সংকটকালে ফি কমানো বা দরিদ্রদের জন্য বিশেষ ছাড় চালু করা সময়োপযোগী উদ্যোগ হতে পারে।

সরকারের পক্ষ থেকেও সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করে ভোগ্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখার বিষয়ে একটি সমঝোতা তৈরি করতে পারেন।
পাশাপাশি ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করে একটি কার্যকর সমন্বয় কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব। বাজার পরিস্থিতি তদারকির জন্য একটি মনিটরিং সেল গঠন করাও কার্যকর হতে পারে।

এ ছাড়া প্রাথমিক পর্যায়ে উৎপাদিত পণ্যের ওপর কর সাময়িকভাবে কমিয়ে ব্যবসায়ীদের উৎসাহিত করা যেতে পারে, যাতে তারা কম দামে পণ্য সরবরাহ করতে পারে। পরিস্থিতি অনুযায়ী এই সুবিধার সময়সীমা বাড়ানোও সম্ভব।

আইন ও বিচার ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও একই ধরনের সহনশীলতা প্রয়োজন। আদালতে মামলা দায়ের বা আইনি সহায়তার ব্যয় অনেক সময় সাধারণ মানুষের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। আইনজীবীরা যদি এই সময়ে কিছুটা নমনীয়তা দেখান, তাহলে বিচারপ্রাপ্তি সহজতর হবে।

এ ছাড়া পাবলিক পরিবহন ভাড়া, অনলাইন ডেলিভারি চার্জ, ব্যাংক ও বীমা খাতের সার্ভিস চার্জ—এসব ক্ষেত্রেও সহনীয় নীতি গ্রহণ করা গেলে সামগ্রিকভাবে জনজীবনে স্বস্তি ফিরবে। প্রতিটি খাত সামান্য ছাড় দিলেও সম্মিলিতভাবে তার প্রভাব হবে বড়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই উদ্যোগগুলোকে দয়া বা অনুদান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি একটি দায়িত্বশীল ও টেকসই অর্থনৈতিক আচরণ। সংকটের সময়ে যারা মানুষের পাশে দাঁড়ায়, ভবিষ্যতে তারাই জনগণের আস্থা অর্জন করে।

অতএব, বর্তমান বৈশ্বিক ও স্থানীয় বাস্তবতায় ব্যবসায়ী ও সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত সাময়িকভাবে মুনাফা কমিয়ে মানুষের কষ্ট লাঘবে এগিয়ে আসা। সম্মিলিত এই উদ্যোগই পারে অর্থনৈতিক চাপের মধ্যেও সমাজে স্থিতিশীলতা ও স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে।

লেখকঃ সাংবাদিক, ডেইলি সান

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *